আজ সরস্বতী পূজা। অর্জুন তার ঘরের জানলার পাশে বসে আছে, হাতে মোবাইল ফোন। বাইরে ক্লাবের মাইকে হালকা সুরের গান বাজছে, কিন্তু তার মনোযোগ পুরোপুরি গেমিং কনসোলের স্ক্রিনে। মা বারবার বলছেন, "অর্জুন, আজ অন্তত ফোনটা রেখে আয়। পূজার কাজে একটু হাত লাগা।"

অর্জুন বিরক্তি নিয়ে জবাব দেয়, "মা, সব তো হয়েই গেছে। এখন আর কী করব?"

আসলে, অর্জুনের কাছে সরস্বতী পূজা মানেই ছিল এক পুরোনো দিনের রীতি। ধূপের ধোঁয়া, মন্ত্রপাঠ, বই-খাতা সব একসঙ্গে জমা করে রাখা—এসব তার কাছে খুব বিরক্তিকর লাগত। তার জগৎটা স্মার্টফোনের ছোট স্ক্রিনে আর ইন্টারনেটের বিশাল পৃথিবীতে। সে ভাবত, মা সরস্বতী কি শুধু পুরোনো বই আর কাগজের বিদ্যার দেবী?

হঠাৎ তার বন্ধু দিশার ফোন এল। দিশা বলল, "কই রে, আসছিস না কেন? আমাদের ক্লাবে তো দারুণ একটা কাজ হচ্ছে!"

অর্জুন বলল, "আসবো কী, এখানে বসেই ভালো আছি। তোদের পুরোনো দিনের পূজা দেখতে ইচ্ছা করে না।"

দিশা হেসে বলল, "আরে বাবা, এটা পুরোনো দিনের পূজা নয়। এটা এখনকার সময়ের পূজা। একবার এসে দেখ।"

অর্জুন অনিচ্ছা সত্ত্বেও গেল। তাদের ক্লাবে গিয়ে সে অবাক হয়ে গেল। পূজামণ্ডপে মা সরস্বতীর নতুন প্রতিমা, কিন্তু একপাশে একটি বড় এলইডি স্ক্রিন লাগানো। সেখানে দেবীর ছবিতে ডিজিটাল আলপনা ফুটে উঠছে। পাশে কয়েকজন ছেলে-মেয়ে ল্যাপটপে বসে কোডিং করছে।

অর্জুন অবাক হয়ে দিশাকে জিজ্ঞেস করল, "এসব কী হচ্ছে?"

দিশা তাকে এক পাশে নিয়ে গেল। সে বলল, "আমরা এই বছর ঠিক করেছি, মা সরস্বতীকে তাঁর আধুনিক রূপে পূজা করব। আমরা শুধু বই দিয়ে নয়, ল্যাপটপ, ট্যাবলেট আর কোডিং দিয়েও তাঁর কাছে জ্ঞান চাইব।"

অর্জুনের ঘোর যেন কাটছিল না। সে দেখল, ক্লাবের এক কোণে একটি ট্যাবলেট রাখা। সেখানে শিশুরা অঙ্কন অ্যাপ ব্যবহার করে সরস্বতী দেবীর ছবি আঁকছে। আরেক পাশে, একজন দাদা প্রজেক্টর দিয়ে বাচ্চাদের সামনে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ছবি দেখাচ্ছেন। তিনি বললেন, "জ্ঞান তো শুধু বইয়ে নেই, জ্ঞান আছে বিজ্ঞানে, ইন্টারনেটে, এমনকি তোমার হাতে থাকা মোবাইলেও।"

অর্জুন সেই দাদার কথা শুনে চুপ করে রইল। তার মনে হলো, এত দিন সে যে জিনিসগুলোকে আধুনিক বলে দূরে ঠেলেছিল, সেগুলোও তো জ্ঞানেরই অংশ। সরস্বতী পূজা শুধু অতীতের নয়, বর্তমান এবং ভবিষ্যতেরও পূজা।

সেদিন অর্জুন তার ফোনটি পকেটে রেখে দিল। সে ছোট বাচ্চাদের কাছে গিয়ে তাদের ছবি আঁকার কাজে সাহায্য করল। সে বুঝতে পারল, মা সরস্বতী হলেন সব জ্ঞানের দেবী, আর সেই জ্ঞানকে সম্মান করার জন্য কোনো পুরোনো বা নতুন পদ্ধতি লাগে না, লাগে শুধু শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা।