এক অচেনা সুরের গল্প

আমাদের ছোটবেলার সরস্বতী পূজা মানে ছিল একরাশ উত্তেজনা আর আনন্দ। ক্লাস ফোর-ফাইভে পড়ার সময় থেকেই আমরা বন্ধুরা মিলে পূজার জন্য চাঁদা তুলতাম। চণ্ডীপুর গ্রামের সেই ছোট্ট স্কুল মাঠে আমরা একটা বাঁশের গেট বানাতাম, আর তার গায়ে সেঁটে দিতাম রঙিন কাগজ।

এবার আমরা ঠিক করলাম, পূজার দিনে একটা নাটক করব। নাটকের নাম ‘বিদ্যাপতির সারস’ (ভেবেছিলাম নামটা বেশ কাব্যিক)। কিন্তু সমস্যা ছিল একটাই—আমাদের মধ্যে কেউ-ই ভালো গান গাইতে পারত না। আমাদের স্কুলের সবচেয়ে ভালো গায়ক ছিল পলাশ। কিন্তু সে একটা দুর্ঘটনায় পা ভেঙে ঘরে বসে ছিল। আমরা সবাই হতাশ হয়ে গেলাম।

পূজার ঠিক দুদিন আগে, আমরা স্কুল মাঠে বাঁশ কাটছি। হঠাৎ পাশের বাড়ি থেকে একটা অপূর্ব সুর ভেসে এল। বাঁশির সুর! এত মন মুগ্ধ করা সুর আমরা আগে কখনো শুনিনি। আমরা সবাই অবাক হয়ে সেই বাড়ির দিকে তাকালাম।

বাড়ির মালিক ছিলেন একজন নতুন লোক। কিছুদিন আগেই শহরে থেকে এসেছেন। তার কোনো বন্ধু ছিল না। আমরা কেউ তার নামও জানতাম না। সুরের টানে আমরা সবাই তার বাড়ির দিকে গেলাম।

আমরা দেখলাম, তিনি ঘরের বারান্দায় বসে একা একা বাঁশি বাজাচ্ছেন। আমরা তার কাছে গিয়ে বললাম, "কাকা, আপনি এত সুন্দর বাঁশি বাজান? আমাদের পূজায় একটু বাজাবেন?"

তিনি আমাদের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। তারপর মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।

পূজার দিন চলে এল। সকাল থেকেই আমাদের ব্যস্ততা। রুবিনা আর পিন্টু মিলে পূজার সব আয়োজন করছে। টুবলু আর আমি মিলে অতিথিদের আপ্যায়ন করছি।

বিকেলে আমাদের নাটক শুরু হলো। আমাদের সবার মন খুব খারাপ ছিল, কারণ নাটকের মাঝে কোনো গান নেই। হঠাৎ, কাকা তার বাঁশি হাতে মঞ্চে এলেন। তিনি স্টেজের এক কোণে বসলেন।

তারপরই শুরু হলো এক অন্যরকম জাদু। তিনি বাঁশিতে এমন একটি সুর তুললেন যা আমাদের নাটকের গল্পের সাথে মিশে গেল। তার বাঁশির সুরে আমাদের নাটক আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠল। মানুষজন মন্ত্রমুগ্ধের মতো আমাদের নাটক দেখছিল।

নাটক শেষ হলো। সবাই উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে লাগল। শুধু আমাদের নাটকের জন্য নয়, কাকার বাঁশির জন্যও।

পরে কাকা আমাদের বললেন যে তিনি খুব একা ছিলেন। শহরের ব্যস্ত জীবন ছেড়ে এখানে এসেছেন মন ভালো করতে। আমাদের পূজা আর আমাদের উৎসাহ দেখে তার খুব ভালো লেগেছে।

সেই বছর থেকে কাকা আমাদের পূজার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেলেন। শুধু বাঁশি বাজানো নয়, আমাদের সব কাজে তিনি সাহায্য করতেন। চণ্ডীপুরের সেই সরস্বতী পূজা আমাদের শুধু জ্ঞান এবং বিদ্যার দেবীর কাছেই নিয়ে যায়নি, বরং এক অচেনা মানুষকে বন্ধু হিসেবে পাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল। সেই বাঁশির সুর আমাদের মনে আজও গেঁথে আছে, যা ভালোবাসা আর বন্ধুত্বের প্রতীক।